ঢাকা , সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ , ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের যুবক যখন অস্ট্রেলিয়ার কিং! রবিন খুদার বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ০২:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৮-০৬-২০২৬ ০২:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের যুবক যখন অস্ট্রেলিয়ার কিং! রবিন খুদার বিলিয়নিয়ার হওয়ার গল্প ফাইল ছবি
১৯৯৭ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ওড়ার অপেক্ষায় একটি বিমান। ভেতরে বসা বছর আঠেরোর এক তরণ। চোখে একরাশ স্বপ্ন, আর পকেটে কেবল কয়েক সপ্তাহের চলার মতো সীমিত কিছু ডলার। মধ্যবিত্ত পরিবারের আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছিলেন তিনি। তখন কে জানত, ঢাকা শহরের ধুলোবালি মেখে বড় হওয়া এই ছেলেই একদিন বিশ্ব প্রযুক্তির মানচিত্র কাঁপিয়ে দেবেন? কে জানত, মাত্র ৪৪ বছরেই অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনকুবেরদের তালিকায় নাম লেখাবেন তিনি?

এই রূপকথার চেয়েও রোমাঞ্চকর গল্পের নায়ক আর কেউ নন; তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অজি বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা। নিজের মেধা, সীমাহীন ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আর দূরদর্শিতাকে পুঁজি করে যিনি আজ বিশ্বজুড়ে এক স্বনির্মিত বিলিয়নিয়ারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ঢাকায় শৈশব ও এক মধ্যবিত্তের স্বপ্ন

রবিনের গল্পের শুরুটা ঢাকার চিরচেনা গলিতে। এখানেই তার বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা করেছেন শের-ই-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন মিরপুরের এসওএস হারম্যান মেইনার কলেজ থেকে। ঢাকার আর দশটা ছেলের মতো রবিনও ক্রিকেট খেলতেন, আড্ডা দিতেন। তবে পড়াশোনায় ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সন্তানদের ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বানানোর যে ট্রেন্ড ছিল, রবিন তার চেয়ে কিছুটা ভিন্ন কিছু করতে চেয়েছিলেন। ব্যবসার হিসাব-নিকাশ তাকে বরাবরই টানত। সেই টানেই ১৯৯৭ সালে পাড়ি জমান ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়ায়।

সিডনির রাজপথে এক লড়াকু ছাত্র

অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর পর জীবনটা মোটেও সহজ ছিল না রবিনের জন্য। বিদেশি শিক্ষার্থী হিসেবে সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইউটিএস) হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন তিনি। পড়াশোনার খরচ চালানো এবং সিডনির মতো ব্যয়বহুল শহরে টিকে থাকার জন্য তাকে করতে হয়েছে কঠোর পরিশ্রম। দিনে বিশ্ববিদ্যালয় আর রাতে পার্ট-টাইম চাকরি—এটাই ছিল তার নিত্যদিনের রুটিন।

তবে শত কষ্টের মাঝেও পড়াশোনায় ঢিল দেননি। ইউটিএস থেকে স্নাতক শেষ করার পরও তিনি থেমে যাননি। নিজের যোগ্যতাকে আরও একধাপ উঁচুতে নিয়ে যেতে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বিশ্বখ্যাত ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ (এমবিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই উচ্চশিক্ষাই পরে তাকে বড় বড় করপোরেট চুক্তি বুঝতে এবং জটিল আর্থিক হিসাব মেলাতে সাহায্য করেছিল।

করপোরেট ক্যারিয়ার ও অন্ধকারের মাঝে আলোর খোঁজ

অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে রবিন যোগ দেন করপোরেট সেক্টরে। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় তিনি আইটি এবং টেলিকম খাতের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ২০০৭ সালে জাপানি টেক জায়ান্ট ‘ফুজিৎসু’র টেলিকম ও ক্লাউড কম্পিউটিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক হন তিনি। এরপর পাইপ নেটওয়ার্কস এবং নেক্সটডিসির মতো বড় বড় কোম্পানিতে প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই চাকরিগুলো করার সময়ই রবিন এক চরম সত্য উপলব্ধি করেন। তিনি দেখতে পান, বিশ্বজুড়ে গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফট আর অ্যামাজনের মতো কোম্পানিগুলো দ্রুত বড় হচ্ছে। এদের কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ডেটা বা তথ্য জমা রাখার জন্য বিশাল জায়গার প্রয়োজন। রবিন বুঝতে পেরেছিলেন, আগামী দিনগুলো হবে ক্লাউড কম্পিউটিং আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই)। আর এই পুরো বিশ্বকে সচল রাখতে দরকার হবে বিশাল আকৃতির ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’। এই সরল আইডিয়াটাই বদলে দেয় তার জীবন।

‘এয়ারট্রাংক’ প্রতিষ্ঠা এবং দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি

২০১৫ সাল। রবিন তার নিরাপদ, বিলাসবহুল করপোরেট চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে পাগল ভাবলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। জন্ম নেয় তার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান ‘এয়ারট্রাংক’। উদ্দেশ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বিশ্বমানের হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা।

কিন্তু আইডিয়া থাকলেই তো আর ব্যবসা হয় না, প্রয়োজন কোটি কোটি ডলারের তহবিল। নতুন এক অভিবাসীর ওপর ভরসা করে অস্ট্রেলিয়ার কোনো ব্যাংক তাকে ঋণ দিতে রাজি হয়নি। রবিন তখন জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি খেললেন। নিজের মাথার ওপরের একমাত্র ছাদ তথা সিডনির বাড়ি বিক্রি করে দিলেন। নিজের সারা জীবনের জমানো পেনশন ও সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকু পর্যন্ত ঢেলে দিলেন এয়ারট্রাংকের পেছনে। পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, রবিন প্রায় দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি।

এশিয়া জয় ও মেগা সফলতার গল্প

কঠিন অন্ধকারের পরই আসে আলোর দেখা। রবিনের দূরদর্শিতা ভুল ছিল না। ২০১৭ সালের মধ্যে তিনি সিডনি ও মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়ার বৃহত্তম ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস তৈরি করতে সক্ষম হন। টেক জায়ান্টরা লাইন ধরে এয়ারট্রাংকের ডেটা সেন্টার ভাড়া নিতে শুরু করে। কারণ রবিন এমন এক সাশ্রয়ী ও পরিবেশ-বান্ধব গ্রিন-এনার্জি মডেল তৈরি করেছিলেন, যা বড় বড় কোম্পানির খরচ এক ধাক্কায় অনেক কমিয়ে দিয়েছিল।

অস্ট্রেলিয়ার পর এয়ারট্রাংক ডানা মেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও। একে একে সিঙ্গাপুর, হংকং, জাপান এবং মালয়েশিয়ায় গড়ে ওঠে এয়ারট্রাংকের চোখ ধাঁধানো সব ডেটা সেন্টার। রবিন খুদা হয়ে ওঠেন এশিয়ার ‘ডেটা সেন্টার কিং’।

ঐতিহাসিক চুক্তি ও বিলিয়নিয়ার হওয়া

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসটি অস্ট্রেলিয়ার করপোরেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডা পেনশন প্ল্যান রবিনের ‘এয়ারট্রাংক’ কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। চুক্তির অংকটা ছিল চোখ কপালে তোলার মতো—২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার (প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা)। এটি বিশ্ব ইতিহাসে ডেটা সেন্টার খাতের অন্যতম বৃহত্তম বাণিজ্যিক চুক্তি।

এই একটি চুক্তির মাধ্যমে রাতারাতি বিশ্ব বিলিয়নিয়ারদের ক্লাবে প্রবেশ করেন রবিন খুদা। কোম্পানিতে নিজের শেয়ারের অংশ থেকেই তার ব্যক্তিগত সম্পদ এক লাফে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্ল্যাকস্টোন কোম্পানিটি কিনে নিলেও রবিনের মেধার ওপর ভরসা রেখে তাকেই গ্লোবাল সিইও হিসেবে বহাল রাখে।

তার এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ সংবাদমাধ্যম অস্ট্রেলিয়ান ফাইন্যান্সিয়াল রিভিউ তাকে ‘বিজনেস পারসন অব দ্য ইয়ার ২০২৪’ স্বীকৃতি দেয়। ২০২৫ সালে তিনি সম্মানজনক ‘সিডনিসাইডার অব দ্য ইয়ার’ খেতাবে ভূষিত হন। বর্তমানে তার কোম্পানি ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলারের এক বিশাল এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার বিনিয়োগের মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
অনুপ্রেরণার অন্য নাম রবিন

ঢাকার গলিতে ক্রিকেট খেলে বড় হওয়া রবিন খুদা আজ অস্ট্রেলিয়ার সিডনির বিলাসবহুল অফিস কক্ষে বসে বিশ্ব প্রযুক্তি খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার এই গল্প কোনো ভাগ্যের জোরে পাওয়া সফলতা নয়। এটি হলো কঠোর পরিশ্রম, নিজের স্বপ্নের ওপর অবিচল বিশ্বাস এবং খাদের কিনারায় দাঁড়িয়েও চরম ঝুঁকি নেওয়ার সাহসের গল্প। রবিন খুদা প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন যদি আকাশছোঁয়া হয় এবং তা তাড়া করার সৎ সাহস থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো বাঁধাই মানুষকে আটকে রাখতে পারে না। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য তিনি এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ